স্কুল-কলেজে পড়ার পর যে সকল বোনেরা কওমী মাদরাসায় পড়তে চান।

স্কুল মাদরাসা

এই লেখাটা দ্বীনীর পথে আসা সেই সকল বোনদের জন্য যারা স্কুল-কলেজে পড়েছেন। স্কুল-কলেজে পড়া ছেড়ে দিয়ে বা স্কুল-কলেজের পড়াশুনা শেষ করার পর এখন কওমী মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার নিয়ত করেছেন। নিচের লেখাগুলো আমি তাদেরকে সম্বোধন করেই লিখেছি।

 

আলহামদুলিল্লাহ্‌, শুকরিয়া আল্লাহ তায়ালার যে তিনি আপনার অন্তরে মাদরাসায় পড়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। বাহ্যিকভাবে আমরা দেখি যে, স্কুল-কলেজে পড়ে দুনিয়াবী যে ফায়দা পাওয়া যায়, মাদরাসায় পড়ে সে রকম দুনিয়াবী কোন ফায়দা পাওয়া যায় না। তারপরেও আপনি স্কুল/কলেজ/ভার্সিটি ছেড়ে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য মাদরাসায় পড়ার ইচ্ছা করেছেন। এর জন্য আপনি আল্লাহ তায়ালার নিকট উত্তম প্রতিদান পাবেন ইনশাআল্লাহ্‌।

 

এবার আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই।

‘আপনি কি সহীহ-শুদ্ধভাবে কোরআন কারীম তিলাওয়াত করতে পারেন?’

যদি পারেন, তাহলে তো ‘আলহামদুলিল্লাহ্‌’।

আর যদি না পারেন, তাহলে আপনার জন্য আমার প্রথম পরামর্শ হল, ‘আপনি কোন মাদরাসার নুরানী-মক্তব বিভাগে ভর্তি হয়ে যান।’

কোরআন কারীম সহীহ শুদ্ধভাবে পড়তে শেখার পূর্বে অন্য কোন বিষয় শেখাটা উচিৎ হবে না। কেননা ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হচ্ছে নামায। আর নামায শুদ্ধ হওয়ার জন্য শুদ্ধভাবে কোরআন কারীম তিলাওয়াত (পড়া) শর্ত। নুরানী-মক্তব বিভাগে আপনি যেমনিভাবে কোরআন কারীম তিলাওয়াত করা শিখতে পারবেন, তেমনিভাবে প্রয়োজনীয় মাসালা-মাসায়েলও আপনি সেখানে শিখে নিতে পারবেন ইনশাআল্লাহ্‌।

 

আর আপনি যদি শুদ্ধভাবে কোরআন কারীম তিলাওয়াত করতে সক্ষম হয়ে থাকেন এবং আলেমা হতে চান, তাহলে কী করবেন?

এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো যে, আরবী ‘আলেমা’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘জ্ঞানী’। কিন্তু কওমী মাদরাসা অঙ্গনে ‘আলেমা’ শব্দটির একটি নিজস্ব অর্থ রয়েছে। এমবিবিএস পাস করলে যেমন কাউকে ‘ডাক্তার’ বলা হয়, তেমনি কওমী মাদরাসায় কোন বোন দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করলে তাকে ‘আলেমা’ বলা হয়ে থাকে।

 

এখন আপনি যদি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণী বা তার নিচের কোন শ্রেণিতে পড়ে এসে থাকেন, তাহলে কোরআন কারীম শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করতে সক্ষম হওয়ার শর্তে মাদরাসায় এসে আপনি তার পরবর্তী ক্লাসে ভর্তি হতে পারবেন।

আর যদি আপনি চতুর্থ শ্রেণী বা তার উপরের কোন শ্রেণীতে পড়ে এসে থাকেন, আপনি যত উপরের শ্রেণীতেই পড়েন না কেন আপনাকে ভর্তি হতে হবে ‘খুসুসী জামাতে’। খুসুসী জামাত এর অর্থ হচ্ছে বিশেষ শ্রেণী। স্কুল-কলেজ এবং হিফজ বিভাগ থেকে আসা ছাত্রীদের জন্য অনেক মাদরাসাতেই এই শ্রেণীটি খোলা হয়ে থাকে।

কিছু মাদরাসায় এই শ্রেণীকে পঞ্চম শ্রেণী এবং কিছু মাদরাসায় এই শ্রেণীকে ষষ্ঠ শ্রেণী (মিজান জামাত) হিসেবে গণ্য করা হয়। আমি মনে করি, এটাকে পঞ্চম শ্রেণীই গণ্য করা উচিৎ। কেননা ষষ্ঠ শ্রেণীর (মিজান জামাতের) কিতাবগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি বছর কমানোর জন্য কম গুরুত্ব দিয়ে যদি দ্রুততার সাথে এই কিতাবগুলো পড়েন, তাহলে পরবর্তীতে জামাতের কিতাবগুলো পড়তে-বুঝতে আপনার অনেক সমস্যা হতে পারে। অবশ্য প্রাইভেটভাবে যদি কারো কাছ থেকে ভালোভাবে শিখে নেন কিংবা আপনার মেধা খুবই ভালো হয়, তাহলে ভিন্ন কথা।

 

এবার প্রশ্নোত্তর আঁকারে কিছু কথা জেনে নেওয়া যাক।

আলেমা হতে কত বছর লাগবে? 

আপনি যদি খুসুসী জামাতে ভর্তি হন এবং আপনার মাদরাসায় খুসুসী জামাতকে পঞ্চম শ্রেণী হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর আপনার আলেমা হতে লাগবে আট বছর।

এই আট বছরের মধ্যে ‘শরহে বেকায়া’ নামে একটি জামাত (শ্রেণী) আছে। অনেক মহিলা মাদরাসাতেই এই জামাতটি পড়ানো হয় না বা বাদ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। আপনি যদি এই জামাতটি না পড়েন, তাহলে আপনার আলেমা হতে লাগবে সাত বছর।

 

 

কোন মাদরাসায় ভর্তি হব?

নিচের বিষয়গুলোর দিকে লক্ষ্য কোন মাদরাসায় ভর্তি হবেন।

১. মাদরাসাটি আপনার বাসা কত দূরে অবস্থিত?

মহিলাদের জন্য উত্তম হল বাসার কাছাকাছি কোন মাদরাসায় পড়া। তবে যদি কাছাকাছি কোন ভালো মাদরাসা না পাওয়া যায়, তাহলে দূরের কোন মাদরাসায় ভর্তি হতে পারেন।

আপনি যদি ঢাকা বা নারায়ণগঞ্জ জেলার বাসিন্দা হোন, তাহলে খুব সহজেই আমার ওয়েবসাইটে এসে মাত্র পাঁচ মিনিটেই আপনার বাসার সবচেয়ে কাছের মাদরাসাটি খুঁজে নিতে পারবেন।

২. ছাত্রী সংখ্যা কেমন?

অনেক মাদরাসা এমন রয়েছে যেই মাদরাসাগুলোর প্রতি শ্রেণীতে দশ জন করেও ছাত্রী নেই। কিন্তু মাদরাসায় আলেমা হওয়া পর্যন্ত সকল বা প্রায় সকল জামাতই রয়েছে। অভিজ্ঞতা হল, এসকল মাদরাসাগুলো পড়াশুনার মান বজায় রাখতে পারে না। অপেক্ষাকৃত বেশী ছাত্রী রয়েছে এমন কোন মাদরাসায় ভর্তি হওয়া ভালো। কেননা যেখানে পড়াশুনার মান ও সুযোগ-সুবিধা ভালো, সেখানেই অপেক্ষাকৃত বেশী ছাত্রী ভর্তি হয়ে থাকে।

৩. বেফাক বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত কিনা?

বাংলাদেশে কওমী মাদরাসাগুলো তদারকি করার জন্য এবং কওমী মাদরাসার শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়ার জন্য কয়েকটি বোর্ড রয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বোর্ড হচ্ছে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক)। বাংলাদেশের প্রতি পাঁচটি মাদরাসার চারটিই এই বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত। এই বোর্ডের পরিক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য এবং বোর্ডের প্রতিনিধি মাদরাসা পরিদর্শন করে বিধায় বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত মাদরাসাগুলো মাদরাসার মান বজায় রাখার জন্য কিছুটা হলেও চেষ্টা করে।

 

৪. সর্বশেষ পরামর্শ হল, কোন মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পূর্বে নিজে গিয়ে মাদরাসার পরিবেশ দেখে নিবেন। আশা করি, আপনার নিজস্ব বিবেচনাবোধ দিয়ে আপনি এমন একটি মাদরাসা খুঁজে পাবেন, যেই মাদরাসার পড়াশুনা ও আমলের পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবে ইনশাআল্লাহ্‌।

 

ভর্তি কবে নেওয়া হয়?

কওমী মাদরাসাগুলোতে শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় হিজরী বর্ষের শাওয়াল মাস থেকে। রোযার ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার পর শাওয়ালের মাসের পাঁচ-সাত তারিখের মধ্যে কওমী মাদরাসাগুলো খোলা হয়। তারপর শাওয়াল মাসের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যেই মাদরাসাগুলোর ভর্তি কার্যক্রম শেষ হয়ে ক্লাস শুরু হয়ে যায়। অবশ্য কোন কোন মাদরাসায় রমযান মাসেই পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের জন্য ভর্তি হওয়ার সুযোগ থাকে।

 

আপনাদের আরও কোন প্রশ্ন থাকলে এই পোস্টের নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারেন। আপনাদের প্রশ্নের উত্তরে এই পোস্টে যোগ করে দেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ্‌।

Facebook Comments

Leave a Comment